মতামত

ভেনিজুয়েলা বনাম আমেরিকা: এক বিষফোঁড়া দমনের নির্মম ইতিহাস

সুমন মাহমুদ শেখ। ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪:৫৭ অপরাহ্ন
news image

মোড়লদের বিশ্বজুড়ে বন্ধুর অভাব নেই। তাদের অপকর্মে কেউ ‘টু’ শব্দ পর্যন্ত করে না। সামরিক, বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক প্রভাববলয়ের ভয়ে প্রায় সবাই নিশ্চুপ। এই পরাক্রমশালী মোড়লদের নাটের গুরু হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রকাশ্য শত্রুর সংখ্যা হাতে গোনা\মাত্র কয়েকজন। সেই বিরল তালিকায় একসময় ছিলেন কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রয়াত ফিদেল ক্যাস্ত্রো ও ভেনিজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রয়াত হুগো শ্যাভেজ। আজ সেই তালিকার সবচেয়ে বড় নাম—নিকোলাস মাদুরো।

সাধারণ মানুষ থেকে বিপ্লবী নেতৃত্বে

ক্যারাকাসের এক সাধারণ গাড়িচালক ছিলেন নিকোলাস মাদুরো। চে গুয়েভারা, ফিদেল ক্যাস্ত্রো ও হুগো শ্যাভেজের সমাজতান্ত্রিক আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন তিনি। শ্রমিক আন্দোলনসহ নানা গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে নিজেকে গড়ে তোলেন সংগ্রামী নেতা হিসেবে। ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন সমাজতান্ত্রিক ভেনিজুয়েলার গণমানুষের প্রতিনিধি।

হুগো শ্যাভেজের মৃত্যুর পর কঠিন রাজনৈতিক বাস্তবতায়, নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে ২০১৪ সালে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এই দুঃসাহসী নেতা। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় রাষ্ট্র পরিচালনায় কিছু ভুল ছিল তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে এটাও সত্য, তিনি কখনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছে মাথা নত করেননি।

•প্রাকৃতিক সম্পদই কাল

ভেনিজুয়েলা ল্যাটিন আমেরিকার অন্যতম প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ দেশ। তেল, সোনা ও মূল্যবান খনিজে ভরপুর এই দেশটিতে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অপরিশোধিত তেলের মজুদ। সোনার ক্ষেত্রেও ভেনিজুয়েলার অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী বিশ্বের মোট সোনা মজুদের একটি বড় অংশ এখানেই রয়েছে।

এই বিপুল সম্পদই মোড়লদের লোভাতুর করে তুলেছে। বহুদিন ধরেই ভেনিজুয়েলাকে কব্জা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। শ্যাভেজ থেকে মাদুরো কেউই সেই লোভাতুর রক্তচক্ষুকে পাত্তা দেননি। আর এখানেই শুরু হয়েছে সব সংকট।

অপহরণ রাজনীতি ও মার্কিন মুখোশ

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের সরকারপ্রধানকে আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে অপহরণ এ দৃশ্য বিশ্ব আবারও প্রত্যক্ষ করল। মানবতা, গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের বুলি আওড়ানো রাষ্ট্রটির আসল চেহারা আরও একবার উন্মোচিত হলো। যার মান নেই, তার আবার অপমান কিসের। অনেকে এটিকে ট্রাম্পের ‘পাগলামি’ বলে ব্যাখ্যা করছেন। বাস্তবে এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—এটি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির পুরোনো অভ্যাস।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

১৯৮৯ সালে পানামার প্রেসিডেন্ট নরিয়েগাকে ‘অপারেশন জাস্ট কজ’-এর মাধ্যমে গ্রেফতার করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অভিযোগ ছিল মাদক চোরাচালান ও স্বৈরাচারিতা। প্রকৃত কারণ ছিল পানামা খালের দখল।

১৯৯৩ সালে সোমালিয়ায় ‘ব্ল্যাক হক ডাউন’ অপারেশন চালানো হয়। সোমালীয় যোদ্ধাদের প্রতিরোধে মার্কিন ডেলটা ফোর্স চরমভাবে ব্যর্থ হয়। এটি আজও মার্কিন সামরিক ইতিহাসের একটি কলঙ্কিত অধ্যায়।

এরও আগে, ১৯৫৩ সালে ইরানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে উৎখাত করে সিআইএ ক্ষমতায় বসিয়েছিল তাদের অনুগত শাহকে শুধুমাত্র তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণের জন্য। ইরানি জনগণ ২৮ বছর পরে সেই পুতুল সরকার উৎখাত করতে সক্ষম হয়েছিল।

ডলার আধিপত্য ও ভেনিজুয়েলার গুরুত্ব

বর্তমানে আমেরিকার মূল সংকট ডলারের আধিপত্য। সৌদি আরবের সঙ্গে পেট্রোডলার চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় ডলারের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ হুমকির মুখে। এই প্রেক্ষাপটে ভেনিজুয়েলার অপরিশোধিত তেল ও সোনা তাদের কাছে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভেনিজুয়েলাকে কব্জা করতে পারলে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল মজুদের ওপর নিয়ন্ত্রণ

পুনরায় পেট্রোডলার ব্যবস্থাকে চাপিয়ে দেওয়া

এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সমাজতান্ত্রিক মাদুরো সরকারই ছিল প্রধান বাধা।

বিরোধী রাজনীতি: বহুল পরীক্ষিত অস্ত্র

মার্কিন কৌশল নতুন নয়। তারা বিরোধী দলকে ব্যবহার করে নেতৃত্ব তৈরি করে, অর্থায়ন করে, আন্দোলন উসকে দেয়। শেষে ক্ষমতা পরিবর্তনের মাধ্যমে তাদের অনুগত পুতুল সরকার প্রতিষ্ঠা করে।

ভেনিজুয়েলায় সেই ‘গুটি’ হলেন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদো। আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরির পর তাকেই ব্যবহার করা হয়েছে মূল হাতিয়ার হিসেবে। তার নেতৃত্বে বিরোধী শিবির ও সরকারের ভেতরের বিশ্বাসঘাতকদের সহায়তায় ৩ জানুয়ারি নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেফতার করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়া হয়।

কারণ একটাই মাদুরো ছিল মোড়লের বিষফোঁড়া।

বাংলাদেশ প্রসঙ্গ ও সতর্কবার্তা

ভেনিজুয়েলার অভিজ্ঞতা থেকে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর শিক্ষা নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ ও ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোকে অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হবে।

বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। পতিত আওয়ামী সরকারের সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের টানাপোড়েন, সিআইএ’র সম্ভাব্য ভূমিকা এবং অভ্যন্তরীণ অনুগত গুটির অস্তিত্ব সব মিলিয়ে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।

এমন বাস্তবতায় বিভেদ ভুলে জাতীয় ঐক্যই হতে পারে একমাত্র রক্ষা কবচ।

•উপসংহার

ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে সাম্রাজ্যবাদ কখনো বন্ধু হয় না। তারা আসে সম্পদের খোঁজে, ক্ষমতার খোঁজে। তাই সময় থাকতে সতর্ক হতে হবে।

সুতরাং সাধু সাবধান।

সর্বশেষ