সারাদেশ
নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার বাকরপুর গ্রামে ব্যতিক্রমধর্মী অংশগ্রহণমূলক কর্মসূচি ‘ধরিত্রীর দরবার-২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) গ্রীন কোয়ালিশন কমিটি ও বারসিকের উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে কৃষক-কৃষাণী, মৃৎশিল্পী, পরিবেশকর্মী ও স্থানীয় গ্রীন কোয়ালিশনের সদস্যরা অংশ নেন।
প্রায় ৩০ জন কৃষক-কৃষাণীর অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনে মাটি, গাছ, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে স্মৃতি, অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ ভাবনা তুলে ধরা হয়। কর্মসূচির সমন্বয় করেন বারসিকের নেত্রকোনা অঞ্চলের ক্যাম্পেইন অ্যান্ড নেটওয়ার্ক ফ্যাসিলিটেটর অনাবিলা সরকার।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করা হয় প্রচলিত ফিতা কাটা বা প্রদীপ প্রজ্বলনের পরিবর্তে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে মাটি ও দেশীয় বীজ বিনিময়ের মাধ্যমে। এ সময় তারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য উর্বর মাটি, দেশীয় বীজ, খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ সংরক্ষণের প্রতীকী অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
পরে অনুষ্ঠিত মাটির সংসদ’ পর্বে কৃষক-কৃষাণীরা জানান, একসময় এ অঞ্চলে কচ্ছপ, সজারু, বাঘাইল্লা, ঘোইল সাপ, হেঁজা, পাতিকাকসহ নানা প্রজাতির প্রাণী ও পাখির বিচরণ ছিল চোখে পড়ার মতো। কিন্তু পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তনের কারণে আজ এসব প্রাণী ও পাখি প্রায় বিলুপ্তির পথে।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, “মাটি আমাদের মা। মাটিই আমাদের জীবন, জীবিকা, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের ভিত্তি।”তাদের মতে, কৃষিজমি ও পরিবেশ রক্ষা ছাড়া মানুষের টেকসই ভবিষ্যৎ সম্ভব নয়।
কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া স্থানীয় মৃৎশিল্পীরা মাটির গুণগত পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা জানান, বর্তমানে অনেক এলাকায় বালুমিশ্রিত মাটি পাওয়া যাচ্ছে, যা দিয়ে মানসম্মত ও টেকসই মৃৎশিল্প তৈরি করা কঠিন। তাদের ভাষায়, এঁটেল মাটিই মৃৎশিল্পের জন্য সবচেয়ে উপযোগী।
আলোচনায় কৃষকরা আরও বলেন, “গাছ আমাদের সম্পদ। মাটি আর গাছই আমাদের আয়ের প্রধান উৎস।” তাদের মতে, গাছ ও মাটি শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, বরং খাদ্য, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ জীবনের মূল ভিত্তি।
পরিবেশের পাশাপাশি বাল্যবিবাহ, নারীর স্বাস্থ্য, পারিবারিক সচেতনতা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়েও মতবিনিময় হয়। অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, সুস্থ পরিবেশ ও সুস্থ সমাজ একে অপরের পরিপূরক।
কর্মসূচির এক আবেগঘন পর্বে অংশগ্রহণকারীরা ধরিত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং স্বীকার করেন যে নির্বিচারে গাছ কাটা, মাটি নষ্ট করা, জলাশয় ভরাট ও পরিবেশ দূষণের মাধ্যমে মানুষ প্রকৃতির প্রতি অন্যায় করেছে। ভবিষ্যতে পরিবেশ সংরক্ষণে আরও সচেতন হওয়ার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তারা।
এছাড়া অনুষ্ঠানে স্থানীয় মাটির তৈরি তৈজসপত্র, কারুশিল্প ও ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্পের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। প্রদর্শনীতে গ্রামীণ সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও অর্থনীতিতে মাটির গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।
আয়োজকদের মতে, ধরিত্রীর দরবার’ শুধু একটি আলোচনা সভা নয়; এটি প্রান্তিক মানুষের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও পরিবেশবান্ধব জীবনচর্চাকে সামনে আনার একটি অংশগ্রহণমূলক উদ্যোগ। তাদের বিশ্বাস, মাটি, গাছ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সর্বশেষ