ময়মনসিংহ
ময়মনসিংহের ভালুকায় পোশাক শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা এবং পরে মরদেহে আগুন দেওয়ার ঘটনাটি শুরুতে হঠাৎ জনরোষ বলে মনে হলেও তদন্তে উঠে আসছে ভিন্ন চিত্র। পুলিশের অনুসন্ধান ও জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য বলছে, ঘটনাস্থলে উপস্থিত কিছু ব্যক্তি পরিস্থিতি ইচ্ছাকৃতভাবে উসকে দিয়ে সহিংসতা বাড়িয়ে তোলে।
এই মামলায় নতুন করে আরও একজনকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। গ্রেপ্তার ব্যক্তির নাম সোহেল রানা (৩৪)। শনিবার (১৪ মার্চ) রাতে উপজেলার জামিরদিয়া ডুবালিয়াপাড়া এলাকায় পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেড কারখানার গেটের সামনে থেকে তাকে আটক করা হয়।
পুলিশ জানায়, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করার কাজ চলছে। সেই ধারাবাহিকতায় অভিযান চালিয়ে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার ঝায়াইল এলাকার তোরাব আলীর ছেলে।
জেলা পুলিশের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত এই মামলায় মোট ২৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে উঠে এসেছে, ঘটনার সময় কিছু ব্যক্তি শ্রমিকদের স্লোগান দিয়ে উত্তেজিত করে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ করে তোলে।
ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, গ্রেপ্তার সোহেল রানা ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে দীপু চন্দ্র দাসকে কারখানার ফ্লোর থেকে গার্ড রুমে নেওয়ার সময় মারধরে অংশ নেন। এছাড়া তিনি অন্যদের উসকানি দিয়ে সহিংসতা বাড়িয়ে দেন এবং মরদেহের ওপর নির্যাতন চালাতে জনতাকে উৎসাহিত করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রথমে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ার পর শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। এরপর কিছু ব্যক্তি ওই উত্তেজনাকে কাজে লাগিয়ে গণপিটুনির পরিস্থিতি তৈরি করে। ঘটনাটি মুহূর্তেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
উল্লেখ্য, গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর রাতে ভালুকার হবিরবাড়ী ইউনিয়নের ডুবালিয়াপাড়া এলাকায় পাইওনিয়ার নিটওয়্যারস (বিডি) লিমিটেড কারখানার শ্রমিক দীপু চন্দ্র দাসকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। শুধু তাই নয়, কারখানা থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কের বিভাজকের একটি গাছে ঝুলিয়ে মরদেহে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে, যা এলাকায় চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
এ ঘটনায় নিহতের ভাই অপু চন্দ্র দাস অজ্ঞাতপরিচয় ১৪০ থেকে ১৫০ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। তদন্তকারীরা বলছেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত আরও কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে—একটি গুজব কীভাবে মুহূর্তে ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নিল? কারা এই উন্মত্ততা ছড়িয়ে দিল এবং কেন? তদন্তের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সর্বশেষ