ময়মনসিংহ
ময়মনসিংহের চরে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী অম্বিকাগঞ্জ মহাবিদ্যালয়ে এখনো কথিত আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের আধিপত্য বজায় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় এলাকাবাসী, অভিভাবক ও কয়েকজন শিক্ষক দাবি করেছেন, রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে কলেজে দীর্ঘদিন ধরে একটি পক্ষ নিজেদের আধিপত্য ধরে রেখেছে। এতে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার্থীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অভিযোগে জানা যায়, ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো অম্বিকাগঞ্জ কলেজেও আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের প্রভাব বাড়তে থাকে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় কলেজ পরিচালনা ও বিভিন্ন দায়িত্ব বণ্টনের অভিযোগ ছিল।
এ কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক মাহবুবুল আলম রাসেলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততা, অনিয়মিত কলেজে উপস্থিতি এবং কোচিং বাণিজ্যের অভিযোগ তুলেছেন এলাকাবাসী ও অভিভাবকদের একটি অংশ। তাদের দাবি, কলেজ চলাকালীন সময়েও তিনি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত থাকেন এবং নিয়মিত ক্লাস নেন না। সপ্তাহে মাত্র দুইদিন কলেজে উপস্থিত হন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে কলেজে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ ফিরবে বলে আশা করেছিলেন তারা। কিন্তু বর্তমানে দায়িত্বপ্রাপ্তদের মধ্যেও আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের উপস্থিতি থাকায় পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হয়নি বলে দাবি তাদের।
এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিএনপি ও জামায়াতপন্থি কয়েকজন শিক্ষকও। তাদের মতে, কলেজকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করতে না পারলে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, কিছু শিক্ষক রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করে নতুনভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে কলেজে বিভিন্ন অনিয়ম, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসদাচরণ এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে।
কলেজের এক শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করে বলেন, নিয়মিত ফি পরিশোধের পরও অতিরিক্ত টাকা ছাড়া পরীক্ষার অ্যাডমিট কার্ড আটকে রাখা হয়। এতে শিক্ষার্থীরা চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মোবারক হোসেন বলেন, “শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় অযোগ্য ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বাদ দিয়ে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে কলেজ পরিচালনা কমিটি গঠন করা প্রয়োজন।”
এদিকে, এলাকাবাসীর একটি অংশ অভিযোগ করেছেন, কলেজের কয়েকজন শিক্ষক আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচি, সভা-সমাবেশ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক মাহবুবুল আলম রাসেলের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার পূর্বের কিছু রাজনৈতিক পোস্ট ও ছবি সরিয়ে ফেলার বিষয়টিও স্থানীয়ভাবে আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
তবে কলেজের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সততার সঙ্গে প্রতিষ্ঠান পরিচালনার চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কয়েকজন অভিভাবক। তাদের দাবি, কিছু শিক্ষকের আচরণ ও অনিয়মের কারণে কলেজের সামগ্রিক পরিবেশ বারবার বিতর্কিত হচ্ছে।
উপজেলা শিক্ষা অফিসার বলেন, “অম্বিকাগঞ্জ কলেজ নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোনো শিক্ষক বা কর্মকর্তা যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অনিয়ম করে থাকেন, তাহলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, “শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনো ধরনের অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসদাচরণের অভিযোগ গ্রহণযোগ্য নয়। অম্বিকাগঞ্জ কলেজ নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ পরিবেশ বজায় রাখতে জেলা প্রশাসন সবসময় তৎপর রয়েছে।”
সর্বশেষ