ময়মনসিংহ

কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগে বহাল নাসিরাবাদ কলেজের অধ্যক্ষ

মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ, নিজস্ব প্রতিবেদক ময়মনসিংহ | ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:২৩ অপরাহ্ন
news image
তদন্ত ও অডিট প্রতিবেদন জমার আট মাসেও ব্যবস্থা নেই, আড়াই কোটি টাকা নগদ ও নিয়োগ বাণিজ্যের প্রমাণ পেয়েছে কমিটি।


ভুয়া বিল-ভাউচার ও নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে ময়মনসিংহ নগরের নাসিরাবাদ কলেজের অধ্যক্ষ আহমেদ শফিকের বিরুদ্ধে। অভিযোগের সত্যতা পেয়ে তদন্ত ও অভ্যন্তরীণ অডিট কমিটি প্রতিবেদন জমা দিলেও আট মাস পার হলেও তার বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং তিনি বহাল তবিয়তে থেকেই কলেজের সব কার্যক্রম পরিচালনা করছেন, যা নিয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

অধ্যক্ষ আহমেদ শফিক স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদ ময়মনসিংহ জেলা শাখার সভাপতি এবং মহানগর আওয়ামী লীগের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তিনি অনিয়ম ও দুর্নীতি চালিয়ে যাচ্ছেন—এমন অভিযোগ তুলেছেন কলেজ সংশ্লিষ্টরা।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ অধ্যক্ষের অপসারণ দাবিতে আন্দোলনে নামেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ৭ অক্টোবর তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার উম্মে সালমা তানজিয়া অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার তাহমিনা আক্তারকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেন।

এক মাসের তদন্ত শেষে কমিটি ভূয়া বিল-ভাউচারে নিয়মিত অর্থ উত্তোলন, কলেজ ফান্ড থেকে আড়াই কোটি টাকা নগদ হাতে রাখা, নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও বাণিজ্যের প্রমাণ পায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়েই এসব কর্মকাণ্ড করা হয়েছে।

পরবর্তীতে কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও বিভাগীয় কমিশনার ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান আকন্দকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের অভ্যন্তরীণ অডিট কমিটি গঠন করেন। অডিট কমিটি ২০১২-১৩ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত মোট ১২ অর্থবছরের হিসাব নিরীক্ষা করে ব্যাপক অনিয়মের তথ্য পায়।

অডিট প্রতিবেদনে দেখা যায়,

২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২৬টি বিলে অধ্যক্ষের একক স্বাক্ষরে ৬ লাখ ৩০ হাজার ৮৮০ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।

২০২০-২১ অর্থবছরে ১১টি বিলে উত্তোলন করা হয় ৬ লাখ ৮৩ হাজার ৮৬৩ টাকা।

২০১৯-২০ অর্থবছরে ২৫টি বিলে উত্তোলন করা হয় ১১ লাখ ৮১ হাজার ৭৫১ টাকা।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, অধিকাংশ বিলেই ভূয়া ভাউচার ব্যবহার ও নিয়মের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। চলতি বছরের ২৩ এপ্রিল অডিট প্রতিবেদন জমা দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।

চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতি নির্বাচিত হন মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক শেখ আমজাদ আলী। তিনি অডিট রিপোর্ট যাচাইয়ের জন্য তিন সদস্যের আরেকটি কমিটি গঠন করেন এবং তিন মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে নির্দেশ দেন। তবে নির্ধারিত সময় পার হলেও ওই কমিটি এখনো প্রতিবেদন জমা দেয়নি।

১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত নাসিরাবাদ কলেজে বর্তমানে শিক্ষার্থী সংখ্যা পাঁচ হাজারের বেশি। শিক্ষক ও কর্মচারী রয়েছেন প্রায় ১২০ জন। ২০১৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি থেকে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আহমেদ শফিক।

তদন্ত কমিটির ছাত্র প্রতিনিধি ও বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতা গকুল সূত্রধর মানিক বলেন,

“কলেজের সুনামের কথা ভেবে আমরা কোনো বিশৃঙ্খলা করিনি। আইনি প্রক্রিয়ায় সবকিছু নিষ্পত্তির জন্য প্রমাণসহ প্রতিবেদন দিয়েছি। অডিটে দেখা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে অধ্যক্ষ একাই ২ কোটি ২৬ লাখ টাকা নগদ হাতে রেখেছিলেন, যার ব্যয়ের কোনো হিসাব নেই। দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও তিনি বহাল থাকাটা হাস্যকর।

অডিট কমিটির প্রধান মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান আকন্দ বলেন, আমরা বিস্তারিত তথ্য-প্রমাণসহ প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। এরপর ব্যবস্থা নেওয়া কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।”

অভিযোগ অস্বীকার করে অধ্যক্ষ আহমেদ শফিক বলেন,

“আমি কোনো তদন্ত প্রতিবেদন পাইনি। আমার বিরুদ্ধে আনা ১৪টি অভিযোগের বিপরীতে ৫৭৩ পৃষ্ঠার লিখিত প্রমাণ ও সাড়ে ১৪ পৃষ্ঠার ব্যাখ্যা দিয়েছি। প্রতি বছরই অডিট হয়, অনিয়মের সুযোগ নেই। নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।

গভর্নিং বডির সভাপতি অধ্যাপক শেখ আমজাদ আলী বলেন,“তিন সদস্যের কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখানে গাফিলতির সুযোগ নেই।”

তবে দীর্ঘ সময় ধরে তদন্ত ও অডিট প্রতিবেদনের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় প্রশ্ন উঠেছে—রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই কি অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিলম্ব হচ্ছে?

সর্বশেষ