সারাদেশ
হাওরাঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় মানুষের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) বেসরকারি গবেষণা সংস্থা বারসিক-এর উদ্যোগে এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা অক্সফাম-এর সহযোগিতায় “হাওরের জলবায়ু সংকট ও স্থানীয় অভিযোজন কৌশল” শীর্ষক এক মতবিনিময় সভা মদন ইউনিয়ন পরিষদের হলরুমে অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মদন উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা ও মদন ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক হাবিবুন নবী। এছাড়া ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধি, কৃষক-কৃষাণী, যুব সংগঠনের সদস্য এবং বারসিকের কর্মকর্তারা সভায় অংশ নেন।
সভায় প্রারম্ভিক বক্তব্যে বারসিকের আঞ্চলিক সমন্বয়কারী মো. অহিদুর রহমান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব হাওরাঞ্চলে এখন দৃশ্যমান ও গভীরতর। আগাম বন্যা, অকাল বৃষ্টিপাত ও নদীর অস্বাভাবিক আচরণ কৃষি, মৎস্য ও জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এই বাস্তবতায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা ও উদ্ভাবনী কৌশলকে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার সঙ্গে যুক্ত করাই সময়ের দাবি।
মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণকারীরা তাঁদের এলাকার বহুমাত্রিক সংকট তুলে ধরেন। আগাম বন্যায় ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে ব্যাপক ফসলহানি, স্থানীয় বীজের সংকট, গোচারণভূমির অভাব, ঢেউয়ের আঘাতে বসতভিটা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, কোল্ড ও হিট ইনজুরি, ফসলের রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ—এসব সমস্যা দিন দিন বাড়ছে। একই সঙ্গে হাওরে মাছের সংখ্যা কমে যাওয়া, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার, প্রাকৃতিক পানির সংকট এবং বর্ষাকালে জ্বালানির ঘাটতির কথাও উঠে আসে। পানি-সহনশীল ধানের জাত না থাকায় কৃষকরা বাড়তি ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।
অংশগ্রহণকারীরা অভিযোগ করেন, বিষ প্রয়োগ, অতিরিক্ত সেচ এবং চায়না দুয়ারি জালের অবাধ ব্যবহারে হাওরের মাছ ও জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে। জলবায়ুগত পরিবর্তন এসব সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে।
তবে প্রতিকূলতার মাঝেও হাওরবাসী তাদের নিজস্ব জ্ঞান ও লোকায়ত প্রযুক্তির মাধ্যমে অভিযোজনের পথ তৈরি করে চলেছেন। বসতভিটার চারপাশে হিজল, করচ, ভিন্না, মুর্তা ও উজাড়ি গাছ রোপণ, বসতভিটা উঁচু করা, টাওয়ার ও মাচা পদ্ধতিতে সবজি চাষ, ভাসমান ও বস্তায় সবজি উৎপাদন, ঝুলন্ত সবজি চাষ—এসব উদ্যোগ ইতিবাচক ফল দিচ্ছে। আগাম ধানের জাত সংগ্রহ ও চাষ, স্থানান্তর পদ্ধতিতে বীজতলা তৈরি, উঁচু মাচার ঘর নির্মাণ, বর্ষার জন্য জ্বালানি সংরক্ষণ এবং উগার পদ্ধতিতে খড় সংরক্ষণসহ নানা কৌশল তারা প্রয়োগ করছেন।
প্রধান অতিথি হাবিবুন নবী বলেন, “উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে মানুষ নিজেই। আপনারা সমস্যাগুলো চিহ্নিত করবেন, সমাধানের পথও বের করবেন। প্রশাসন ও উন্নয়ন সংস্থা পাশে থাকবে। হাওরের উন্নয়নে স্থানীয় অংশগ্রহণ ও পরামর্শই সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই পথ।”
সভায় বক্তারা জানান, হাওরের উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্থানীয় বাস্তবতা, প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও জনগণের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব না দিলে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন সম্ভব নয়। তাই জনসম্পৃক্ততাকে কেন্দ্র করে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সর্বশেষ